Categories
জাতীয়

সম্প্রীতির বিরল দৃষ্টান্ত, একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির

যেন ধ’র্মীয় সম্প্রীতির অনন্য এক দৃষ্টান্ত লালমনিরহাটে। এক উঠানে তাও পাশাপাশি অবস্থিত শতবর্ষী ম’সজিদ আর মন্দির। এবারও মন্দিরে হচ্ছে দুর্গোৎসব। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে হিন্দু-মু’সলমান এখানে যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছেন যার যার ধ’র্ম; উৎসবেও এর ব্যতিক্রম নয়।

 

নেই সংঘাত, আছে শুধুই সম্প্রীতি। দুর্গাপূজায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বেশ ঝাকজমকভাবে তাদের ধ’র্মীয় উৎসব পালন করছেন। ম’সজিদ কমিটি’র লোকজন মন্দির কমিটি’র লোকজনকে বেশ সহযোগিতাও করছেন। ধ’র্মীয় সম্প্রীতি কী’? ধ’র্মীয় সম্প্রীতি কাকে বলে? আর তা কেমন হওয়া উচিৎ এটা জানার জন্য ও দেখার জন্য সবার যেন এখানে আসা উচিৎ।

 

একই আঙিনার পুরান বাজার জামে ম’সজিদটি জে’লার ঐতিহ্যবাহী একটি ম’সজিদ। এখানে নামাজ আদায় করতে দূর-দূরান্ত থেকেও মু’সল্লিরা আসেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে এই ম’সজিদে সবসময় মু’সল্লিদের ভিড় থাকে।

 

মন্দিরটিতে রয়েছে শ্রী শ্রী কালী মূর্তি, দেবাদিদেব মহাদেব, শ্রী শ্রী বাবা লোকনাথ। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় স্বাভাবিক নিয়মে চলছে পূজার্চনা। এখানে রয়েছে শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির। প্রতি বছরের মতো এ বছরও জাঁকজমক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা।

 

ঝগড়া, বাকবিতণ্ডা, অ’ভিযোগ বা অনুযোগ ছাড়াই যুগের পর যুগ একই আঙিনায় মন্দির ও ম’সজিদে বিরাজ করছে ধ’র্মীয় সম্প্রীতি। এ যেন সম্প্রীতির মহা মিলন। পৃথিবীজুড়ে চলমান সহিং’সতা আর সাম্প্রদায়িক সং’ঘর্ষের সংবাদের মধ্যে এমন দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বা’স করা কঠিন। একই আঙ্গিনায় মন্দির ও ম’সজিদ স্থাপন করেছে ধ’র্মীয় সম্প্রীতির বিরল দৃষ্টান্ত।

 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এই আঙিনায় গড়ে উঠে একটি জামে ম’সজিদ। নাম দেয়া হয় পুরান বাজার জামে ম’সজিদ। পরে মু’সল্লিদের সহযোগিতায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে ম’সজিদের অবকাঠামোতে। এক সময় এলাকাটি হয়ে উঠে নয়নাভিরাম।

 

এ প্রসঙ্গে খতিব মা’ওলানা আবুল কালাম বলেন, এখানকার হিন্দু এবং মু’সলিম যারা আছেন তাদের অন্তরে কোন দ্বিধা নাই দ্বন্ধ নাই। যার যা ধ’র্ম, সে যথা নিয়মে পালন করে। পুরোহিত শংকর চক্রবর্তী জানান,’আমাদের মধ্যে ধ’র্ম নিয়ে কোন বিবাদ নাই। মা’রামা’রি, কা’টাকাটি, হানাহানি নাই। আম’রা এখনও পর্যন্ত ভালো আছি।’

 

স্থানীয়রা বলছেন, যেকোনো উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে আসছেন উভ’য় ধ’র্মের মানুষ। তাদের সম্প্রীতির অনন্য এই নির্দশন দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থানের লোকজন ছাড়াও আসেন বিদেশিরাও। স্থানীয়রা জানান,’আমাদের ম’সজিদে যখন নামজ শুরু হয়, তখন তারা পূজা বন্ধ করে দেন। এভাবেই আম’রা যার যার ধ’র্ম পালন করি। হিন্দু এবং মু’সলিম ভাতৃত্ববোধ এটা নজির বিহীন।’

 

দর্শনার্থী মুক্তি রানী বলেন, ‌সম্প্রীতির ‌‌‘অনেক আগেই একই আঙিনার মন্দির ও ম’সজিদ আছে শুনেছিলাম। কিন্তু, দেখতে আসার সময় হয়নি। এখন সময় পেলাম তাই দেখতে এলাম। খুবই ভালো লাগছে, আমি মুগ্ধ। এমন দৃশ্য যদি সারা’বিশ্বে থাকতো তাহলে ধ’র্ম নিয়ে সাম্প্রদায়িক সং’ঘর্ষ হতো না। বিরাজ করতো শুধু শান্তি আর শান্তি।’

 

কথা হয় ম’সজিদের মুয়াজ্জিন রফিকুল ইস’লামের সঙ্গে। দীর্ঘদিনের অ’ভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘ম’সজিদে আজান ও নামাজের সময় কোনো দিন কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। এ সময়টাতে মন্দিরে পূজার্চনা হলেও কোনো ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো থেকে বিরত থাকেন তারা। মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে আমা’র সবসময় কথা হয়, ধ’র্মীয় রীতিনীতি নিয়ে আলোচনা হয়।’

 

স্থানীয়রা বলছেন, কালীবাড়ি মন্দিরটি প্রায় ২০০ বছর পুরনো। তৎকালীন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজার্চনা করতেন। তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও মন্দিরটি থেকে যায় অক্ষত। পরবর্তীতে অবকাঠামোগত কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

 

ওই এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, একই আঙ্গিনার ম’সজিদ ও মন্দির ধ’র্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। আর এই সম্প্রীতির চিত্র নিজের চোখে দেখার জন্য প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। অনেক সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে দর্শনার্থীরা ঐতিহ্যবাহী এই ম’সজিদ ও মন্দির স’ম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান।

 

তিনি আরো বলেন, যুগের পর যুগ একই আঙিনায় একই সঙ্গে মু’সলিম ও হিন্দুরা নিজ নিজ ধ’র্মীয় রীতিনীতি পালন করে আসছেন। কিন্তু, কোনো দিনই কোনো ধরনের সমস্যা বা রেষারেষি হয়নি। আম’রা উভ’য় ধ’র্মের মানুষ এখানে হাসিমুখে থাকি, ধ’র্ম পালন করি।

 

স্থানীয় ব্যবসায়ী সুকুমা’র রায় বলেন, একই আঙিনায় ম’সজিদ ও মন্দির আর যুগের পর যুগ ধরে একই সঙ্গে চলছে ধ’র্মীয় আচার পালন। কিন্তু, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা পূজার্চনা করতে কোনো দিনই কোনো বাঁ’ধার মুখে পড়েননি। মন্দিরে বড় ধরনের ধ’র্মীয় উৎসবের আয়োজন করা হলে এখানকার মু’সলিম সম্প্রীতির স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, ‘দেশ-বিদেশে কোথাও কোনো ধরনের ধ’র্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলেও এখানে তার প্রভাব পড়েনি।

 

মন্দিরের পুরোহিত সঞ্জয় কুমা’র চক্রবর্তী বলেন, ‘মন্দিরে নিয়মিত পূজার্চনা হয়। আজান ও নামাজের সময় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়। ধ’র্মীয় সম্প্রীতির বিঘ্ন ঘটে এমন অবস্থার মধ্যে আমাকে কোনো দিনই পড়তে হয়নি। বরং স্থানীয় মু’সল্লিদের সহযোগিতা পেয়ে আসছি।’

 

লালমনিরহাট সদর উপজে’লা পরিষদের চেয়ারম্যান কাম’রুজ্জামান সুজন জানান, তিনি প্রতিদিনই এই ম’সজিদে নামাজ আদায় করেন। সময় পেলেই মন্দিরে আসা ভক্তদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে ধ’র্মীয় সম্প্রীতি অটুট ছিলো, আছে আর থাকবে। কোনো দিনই এই সম্প্রীতিতে কোনো দাগ পড়েনি আর পড়বেও না। সারা’বিশ্বেও যদি ধ’র্মীয় সহিং’সতা বাধে তবুও এখানকার ধ’র্মীয় সম্প্রীতি থাকবে অটুট। এটাই আমাদের বিশ্বা’স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *