Categories
আন্তর্জাতিক

লাদাখের যে বিখ্যাত মুসলিম অভিযাত্রীর নামে গালওয়ান উপত্যকার নামকরণ

ভারতের লাদাখের গালওয়ান উপত্যকার নামটা এখন সারা দুনিয়াতেই খুব চেনা। প্রতিবেশী দুই পর’মাণু শ’ক্তিধর ভারত ও চীনের সর্বশেষ সংঘা’তের স্থান। স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে দু’দেশের কাছেই অতি গুরুত্বপূর্ণ এই উপত্যকা। তবে অনেকেরই হয়তো জানা নেই, সোয়াশো বছর আগে এর নামকরণ করা হয়েছিল লাদাখেরই এক কিংবদন্তী পর্বতারোহী ও অভিযাত্রী গুলাম রসুল গালওয়ানের নামে।

 

সেই ঔপনিবেশিক আমলে কোনও ভৌগোলিক নিদর্শন, তা সে পর্বতশৃঙ্গই হোক বা উপত্যকা-গিরিখাতই হোক নেটিভ বা দেশি অভিযাত্রীদের নামে নাম রাখার ঘটনা ছিল খুবই বিরল।হিমালয়ান জার্নালের দীর্ঘদিনের সম্পাদক হরিশ কাপাডিয়ার কথায়, ‘ব্রিটিশ অভিযাত্রীদের নামে নামকরণ করাটাই তখন ছিল দস্তুর- গালওয়ান উপত্যকা ছাড়া আর কোথাও কোনও নেটিভের কপালে এই সম্মান জুটেছে এমন একটি দৃষ্টান্তও আমার জানা নেই।’

 

লাদাখের ধূসর পাহাড় আর তুষারধবল শিখর দিয়ে ঘেরা রুক্ষ ও প্রশস্ত, পাথুরে এক ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে গালওয়ান নদী, যার উৎস কারাকোরামের গিরিকন্দরে। আকসাই চীন ও পূর্ব লাদাখের মধ্যে দিয়ে প্রায় আশি কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে এই প্রবাহ গিয়ে মিশেছে শিয়ক নদীতে – যা আবার সিন্ধুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনদী।কিন্তু গুলাম রসুল গালওয়ানের নাম কীভাবে জুড়ে গেল এই নদীটির সঙ্গে?

 

কাশ্মী’রি ভাষায় ‘গালওয়ান’ শব্দের অর্থ হল ডা’কাত। গুলাম রসুল গালওয়ানের পিতামহ কারা গালওয়ান ছিলেন উনিশ শতকের কাশ্মীরে বিখ্যাত এক দ’স্যু – ধনীর সম্পদ লুটে গরিবের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য তার খ্যাতি ছিল রবিনহুডের মতো।কাশ্মীরের মহারাজার শোওয়ার ঘরে ঢুকে পড়ে তার গলাতেও কারা গালওয়ান ছু’রি ধরেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। কিন্তু পরে রাজার সৈ’ন্যদের পাতা ফাঁ’দে ধরা পড়েই কারার ফাঁ’সি হয় – আর তার পরিবারের সদস্যরা পা’লিয়ে যেতে বাধ্য হন লাদাখে। কিন্তু ততদিনে তাদের নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেছে গা’লওয়ান বা ডা’কাত শব্দটি।

 

গুলাম রসুল গালওয়ানের জন্ম লাদাখের রাজধানী লেহ-তে, সম্ভবত ১৮৭৮ সালে। বিধবা মা তাকে বড় করে তুলছিলেন। কিন্তু চরম দারিদ্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে মাত্র বারো-তেরো বছর বয়স থেকেই তিনি ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের সঙ্গে নানা অভিযানে সামিল হতে শুরু করে। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৮৯২ সালে চার্লস মা’রে’র সঙ্গে পামীর ও কাশগড় পর্বত অভিমুখে এক অভিযানে বেরিয়ে।লাদাখের বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবদুল গণি শেখ লিখেছেন, ওই দলটি লাদাখের এক দুর্গম অঞ্চলে উঁচু উঁচু পর্বতমালা আর খাড়া গিরিখাতের এক মাঝখানে পড়ে থমকে গিয়েছিল। যেখান থেকে বেরোনোর কোনও রাস্তা দেখা যাচ্ছিল না।

 

গুলাম রসুল সেই গোলক ধাঁধা খুঁজতে নিজেই বেরিয়ে পড়েন। তারপর খাদের ভেতর দিয়ে তিনি একটা রাস্তা খুঁজেও বের করেন। যার ফলে ওই অভিযান শেষ পর্যন্ত কোনও ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সম্পন্ন হয়।অভিযাত্রী দলের নেতা চার্লস মা’রে কিশোর গুলাম রসুলের প্রতিভায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি নতুন রাস্তাটির নামকরণই করে ফেলেন ‘গালওয়ান নালা’। সেই থেকেই গুলাম রসুল গালওয়ান লাদাখের শুধু ইতিহাস নয়, ভূগোলেরও অংশ হয়ে গেছেন।

 

সামান্য মালবাহক ও টাট্টু ঘোড়ার চালক থেকে গুলাম রসুল গালওয়ান লেহ-তে নিযুক্ত ব্রিটিশ জয়েন্ট কমিশনারের ‘আকসকল’ বা প্রধান সহকারীর পদেও উন্নীত হয়েছিলেন। আর অভি’যানে বেরিয়ে পড়াটা ছিল তার নেশা, অর্থকষ্ট মিটে যাওয়ার পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি যে কত অভি’যানে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা পথপ্রদর্শন করেছেন তার কোনও হিসেব ইতিহাসবিদদের কাছেও নেই। তথ্যসূত্র : বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *