Categories
জাতীয়

টেকনাফ থেকেই যেভাবে ২০০ কোটি টাকা কামিয়েছে ওসি প্রদীপ!

ওসি প্রদীপ কুমার দাস পর্যটন শহর কক্সবাজারের জন্য এক আ’তংকের নাম। মেরিন ড্রাইভ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ পর্যটন স্পট। এই স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ ঘিরে একপাশে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে উত্তাল ঢেউ ও গাছের সারি। অন্যপাশে উচুঁ পাহাড়ের হাতছানি।
গত দুই বছরে শুধু মেরিন ড্রাইভেই শতাধিক লা’শ ফেলেছেন প্রদীপ। মানুষের র’ক্তে তিনি এমনই আ’সক্ত হয়েছিলেন— প্রতিদিন মা’দক নির্মূলের নামে ক্রসফা’য়ার করে র’ক্তের ঘ্রাণ নিতেন ভ’য়ঙ্কর কিলার টেকনাফ থা’নার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তার ক্রসফা’য়ারের রোষানল থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁ’চতে পারেনি মেরিন ড্রাইভ নির্মাণে যাদের অ’ক্লান্ত পরিশ্রম, তাদের সাবেক সহকর্মী মেজর সিনহা মোহা’ম্মদ রাশেদ খানও।
যার হ’ত্যার ঘ’টনায় প্রদীপরাজ্যেরও পতন হয়েছে। পু’লিশ সূত্রে জানা গেছে, শুধু টেকনাফেই গত ২২ মাসে প্রদীপের আমলে তার হাতে ১৪৪টি ক্রসফা’য়ারের ঘ’টনা ঘ’টেছে। এসব ঘ’টনায় মা’রা গেছে ২০৪ জন। তাদের অর্ধেকের বেশি লা’শ পড়েছিল স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভে।
যারা তার হাতে মা’রা গেছে, তাদের পরিবারগুলোও বর্তমানে নিঃস্ব হয়ে গেছে। যাকে ক্রসফা’য়ার করা হতো, তাকে ক্রসফা’য়ারের আগে অন্তত ১০ থেকে ১২ দিন থা’না হাজতে রাখা হতো। এমন ঘট’নাও রয়েছে— মাসের পর মাস হাজতেই রাখা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে থা’না হাজতে থাকার ব্যক্তির পরিবার পরিজনের কাছ থেকে ক্রসফা’য়ার না দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আদায় করা হতো লক্ষ লক্ষ টাকা।
পাশাপাশি স্বর্ণলংকার। কিন্তু শেষ সম্বল পর্যন্ত প্রদীপের হাতে তুলে দিয়েও বাঁচতে পারেনি অনেকেই। টেকনাফ উপজে’লা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, দীর্ঘজীবনে অনেক পু’লিশ অফিসার দেখেছি। কিন্তু টাকার জন্য র’ক্তের ঘ্রাণ নেওয়ার অফিসার দেখি নাই।
ক্রসফায়া’রের নামে মানুষ খু’ন করা ছিল ওসি প্রদীপের নে’শা। টেকনাফে তার কর্মজীবনে অন্তত দুই শত কোটি টাকা এই ওসি প্রদীপ নিয়ে গেছে। নুরুল বশর আরও বলেন, যদি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা টেকনাফের হাতেগোনা ৫-৬ জন লোককে ডেকে জি’জ্ঞাসাবাদ করে তাহলে তার ক্রসফা’য়ার ও চাঁদাবাজির লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসবে।
এর মধ্যে রয়েছেন টেকনাফের দুই জন বিখ্যাত গরু ব্যবসায়ী। এদের একজন টেকনাফ সদরের গুদারবিল এলাকার ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু ছৈয়দ। অপরজন সাবরাংয়ের ৫নং ওয়ার্ডের আছারবনিয়ার ইউপি সদস্য শরীফ প্রকাশ শরীফ বলি। এই দুই গরু ব্যবসায়ী মিয়ানমার থেকে গরু এনে টেকনাফ হয়ে বিক্রি করত চট্টগ্রামে।
আর গরু বিক্রির টাকা চট্টগ্রামে বুঝে নিতো ওসি প্রদীপের লোকজন। পরে টেকনাফের ক্রসফা’য়ারের চাঁদাবাজির টাকা জমা হতো দুই মেম্বারের হাতে। এভাবে চলেছে প্রদীপের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মত আ’টক ও ক্রসফা’য়ারের হু’মকি বাণিজ্য।
এদের পাশাপাশি রয়েছে স্বর্ণ কেনার আরেক মহাজন। যার নাম চট্টগ্রামের সজল ধর। যার কাছে প্রদীপের কোটি কোটি টাকার স্বর্ণালংকার বিক্রি হতো। যেসব মা’দক ব্যবসায়ীদের ঘরে অ’ভিযান হতো বা যাদের হাজতে আ’টকে রাখা হতো তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায়ের পাশাপাশি আদায় করা হতো স্বর্ণলংকার।
ওই স্বর্ণালংকার যেত সজল ধরের কাছে। একইভাবে টাকা আদায়ের আরেক মেশিন ছিল টেকনাফ কমিউনিটি পু’লিশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল হোসাইন। এই নুরুল হোসাইন প্রতিনিয়ত পু’লিশের হাতে আ’টক আ’সামিদের পরিবারের স্বজনদের ভ’য়ভী’তি দেখিয়ে আদায় করতো লক্ষ লক্ষ টাকা।
জানা গেছে, নুরুল হোসাইন গত ২৭ জুলাই সেন্টমার্টিন থেকে আ’টক করা পূর্বপাড়ার জামাল উদ্দিনের ছেলে মাছ ব্যবসায়ী জুবাইরকে ক্রসফা’য়ার থেকে বাঁ’চানোর হু’মকি দিয়ে জুবাইরের ভাই ইউনুচ থেকে দুই দফায় ওসি প্রদীপের নাম ভা’ঙ্গিয়ে ১০ লাখ টাকা নেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) পর্যন্ত জুবাইরকে থা’না হাজতে রেখে দেয় পু’লিশ।
পরে দালাল নুরুল হোসাইনের বি’রুদ্ধে উপজে’লা কর্মক’র্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন স্থানে টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করে আ’টককৃত জুবাইয়ের ভাই ইউনুচ। সূত্রমতে, টেকনাফ থা’নার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ গত ২৪ জুলাই রাতে উখিয়ার কুতুপালং গিয়ে মৌলভি বখতিয়ার নামের একজন ইউপি সদস্যকে ধ’রে নিয়ে যান।
এছাড়া একই অ’ভিযানে আ’টক করে তাহের নামের আরো একজন রোহিঙ্গাকে। এক দিন পর দুজনের ভাগ্যে জোটে কথিত ‘ব’ন্দুকযু’দ্ধ’। এ ঘ’টনায় দা’য়ের করা মা’মলায় উল্লেখ করা হয়, মৌলভি বখতিয়ারের ঘর থেকে ১০ লাখ নগদ টাকা এবং ২০ হাজার ইয়াবা উ’দ্ধার করা হয়েছে।
জানা গেছে, ঘ’টনার পর একটি বিশেষ সংস্থার কাছে দেওয়া জবানব’ন্দিতে নি’হত মৌলভি বখতিয়ারের স্ত্রী জানিয়েছেন, সেই রাতে ওসি প্রদীপ কুমারের নেতৃত্বে পু’লিশি অ’ভিযানে নগদ ৫১ লাখ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মৌলভি বখতিয়ারের এক ছেলেকে ডেকে নিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় আরো বিপুল অঙ্কের টাকা।
অর্থ স্বর্ণালংকার সব হাতিয়ে নিয়ে ইউপি সদস্য বখতিয়ারকে দেওয়া ক্রসফা’য়ার। সূত্র আরও জানায়, টেকনাফের হোয়াইক্যং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সহসভাপতি মুফিদ আলমকে ক্রসফা’য়ারের নামে ধরে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা আদায় করা হয়। একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাকের আলমকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে ক্রসফায়া’রের ভ’য় দেখিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় ২০০টি ইয়াবা দিয়ে। এদিকে গত ২২ মাসে টেকনাফ থা’নার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ইয়াবা মা’মলা ও ক্রসফা’য়ারের হু’মকি বাণিজ্যের আপাত অবসান ঘটে ৩১ জুলাই সেনাবাহি’নীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহা’ম্মদ রাশেদ খানকে তার কিলিং মিশনের অন্যতম সহযোগী ইন্সপেক্টর লিয়াকত কর্তৃক গু’লি করে হ’ত্যার ঘ’টনায়।
এই ঘট’নায় আদালতের নি’র্দেশমতে গত বুধবার (৫ আগষ্ট) রাতে ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীকে প্রধান আসা’মি ও ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২নং আ’সামী করে ৯ জনের বি’রুদ্ধে মা’মলা রেকর্ড হয়েছে। মা’মলার অন্য আ’সামিরা হল এসআই নন্দ দুলাল র’ক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদু’ল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা।
এই মা’মলার সূত্র ধরে চট্রগ্রাম থেকে আ’টক হয় বহু বি’র্তকিত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। পরে জামিন না মঞ্জুর করা হয় ওসি প্রদীপসহ এই মা’মলার সাত আ’সামির। এসব বিষয় নিয়ে কক্সবাজার পু’লিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, যদি ঘটনার পর কোন ভুক্তভোগী লিখিত অ’ভিযোগ করত তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
সাবেক সেনা কর্মক’র্তা মেজর সিনহা মোহা’ম্মদ রাশেদ খান হ’ত্যার পর কক্সবাজারের এই পু’লিশ সুপার গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘শামলাপু‌রের লোকজন ওই গা‌ড়ির আরোহীদের ডা’কাত স‌’ন্দেহ ক‌রে পু‌’লিশকে খবর দেয়। এই সম‌য়ে পু‌’লিশ চেক‌পো‌স্টে গা‌ড়ি‌টি থামা‌নোর চে’ষ্টা ক‌রে।
কিন্তু গা‌ড়ির আরোহী একজন তার পি’স্তল বের ক‌রে পু‌’লিশ‌কে গু‌’লি করার চে’ষ্টা ক‌রে। আত্মরক্ষা‌’র্থে পু‌’লিশ গু‌’লি চালায়। এতে ওই ব্যক্তি মা’রা যান।’ পু’লিশ সুপার তখন আরও জানিয়েছিলেন, ‘এই ঘ’টনায় দু‌টি মা’মলা হ‌য়ে‌ছে। দুজনকে আ’টক করা হ‌য়ে‌ছে। পু‌’লিশ পি’স্তল‌টি জ’ব্দ ক‌রে‌ছে।
এ ছাড়া গা‌ড়ি‌তে ত’ল্লাশি ক‌রে ৫০টি ইয়াবা, কিছু গাঁজা এবং দুটি বি‌দেশি ম‌’দের বোতল উ’দ্ধার করা হ‌য়ে‌ছে বলে দাবি করেন।’ পু’লিশ সুপারের এই দাবি নিয়ে তখনই স’ন্দেহ তৈরি হয় বিভিন্ন মহলে।
Image may contain: 5 people, people standing
Like
Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *