Categories
জাতীয়

প্রত্যেক রাতে সিনহা আমার মশারি টানিয়ে দিত, বলেই কাঁদলেন মা

‘আমা’র ছে’লে একজন শহীদ। একজন বীরের র’ক্ত এবং মায়ের অশ্রু বৃথা যেতে পারে না। আশা করি পরম করুণাময় তাকে জান্নাতে আশ্রয় দিবেন। আমা’র ছে’লে বাস্তবের একজন নায়ক ছিল, সে সাহসের সাথে মৃ’ত্যুকে বরণ করেছে, সে কোনও কাপুরুষ ছিলো না, সে একজন জাতীয় বীর ছিল।’- কথাগুলো আর কারও নয়, পু’লিশের গু’লিতে নি’হত মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের বৃদ্ধ মায়ের।

 

মেজর (অব) রাশেদ খান সিনহার মা নাসিমা আখতার বলেছেন, সিনহা কক্সবাজারে এক মাসের জন্য থেকে একটা তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা জানালো। আমি সম্মতি দিয়েছিলাম। সে বিয়ে করেনি, আর আমিও তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইনি। ২৬ জুলাই ছিল ওর জন্ম’দিন। অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে সে যে রিসোর্টে ছিল সেখানে এক বাক্স চকলেট পাঠিয়েছিলাম। কোরবানির ঈদের সময় ছে’লেটা আমাকে কক্সবাজারে গিয়ে ওর সাথে ঈদ করতে বলছিল, কারণ তথ্যচিত্রের শুটিঙয়ে নাকি আরও কয়েকদিন সময়ের দরকার ছিলো। অ’সুস্থতার কারণে আমা’র যাওয়া হয়ে উঠেনি।

 

ছে’লের ব্যাচ’মেটদের সিনহার মা জানিয়েছেন, কক্সবাজার থেকে পু’লিশ তাঁকে ফোনে তাঁর ছে’লে স’ম্পর্কে বিভিন্ন খোঁজ খবর নিয়েছেন। কিন্তু মৃ’ত্যুর সংবাদ তাকে জানানো হয়নি।মা নাসিমা আখতার বলেন, ছে’লেটার তীব্র ভ্রমণের নে’শা ছিল। যখন সে জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা মিশনে ছিল, ছুটিতে বাংলাদেশে আসতো না। তার বদলে দুই মাসের ছুটিতে ইউরোপ গিয়ে গাড়ি করে হাজার হাজার মাইল ড্রাইভ করে নিজে নিজে ঘুরেছিল। এটা আমা’র খুব ভালো লেগেছিল কারণ ছে’লেটা অন্তত নিজের একটা স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছিল। আমা’র পূর্ণ সম’র্থন ছিল এই সিদ্ধান্তের প্রতি।

 

সে সমুদ্র ভালোবাসতো, সে সৈকতে বই পড়তে পড়তে সময় কা’টাতে চাইতো। শৈশব থেকেই সে অ্যাডভেঞ্চারের ভক্ত ছিল। সারা বিশ্ব ভ্রমণের এক প্রগাঢ় সাধ ছিলো তার, যে জন্য বাংলাদেশ সাম’রিক বাহিনী থেকে সে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছিল। আমি তাকে নিষেধ করি নাই। তার হিমালয়ে যাবার স্বপ্ন ছিল, ছে’লেটা হাইকিং পছন্দ করতো, জা’পানে একটা সাইকেল ট্যুরে যেতে চেয়েছিলো।

 

চাকরি থেকে অবসরের পরপরই সে তাঁর এই স্বপ্নগুলো ছোঁয়ার জন্য প্রস্তত হচ্ছিল। এর মাঝে করো’না মহামা’রি চলে এলো। দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হবার ক’দিন পরে সে জানালো যে তাকে নিয়মিতই বাহিরে যাতায়াত করতে হয়, এবং আমি একজন বয়স্ক মানুষ, তাই তার এই চলাফেরা আমা’র জন্য বেশি ঝুঁ’কিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

 

এরপর সে বলল যে রাজশাহী যাবে কিছুদিনের জন্য, সেখানে তাঁর এক বন্ধুর মা (যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্ম’রত ছিলেন) এক বিশাল লাইব্রেরি করেছেন। ছোট থেকেই সে প্রচুর বই পড়তো। তাই তাকে আমি সেখানে যেতে দিলাম, বললাম প্রচুর পড়াশোনা করতে। সে রাজশাহীতে প্রায় চার মাস ছিল এবং আস্তে আস্তে নিজেকে বিশ্ব ভ্রমণের জন্য প্রস্তত করছিল। রাজশাহী থেকে ফিরে মাত্র ক’দিন আমা’র সাথে ছিল। তারপর আমা’র অনুমতি নিয়ে কক্সবাজারে শুটিংয়ের জন্য যায়।

 

আমা’র ছে’লেকে তার কোনও ইচ্ছের বি’রুদ্ধে আমি আ’ট’কে রাখি নাই, কোন সময়েই না। যা যা সে করতে চেয়েছে আমি স্বাধীনতা দিয়েছি। অবশ্য সে আমাকে সবসময়ই বুঝিয়ে ফেলতে সক্ষম হতো কোন না কোনভাবে। আমাকে না বুঝিয়ে সে একটা কাজও করেনি। সে সবসময়ই আমা’র অনুমতি নিয়ে নিত সেই কাজগুলোর জন্য যেগুলো তাকে সুখি করতে পারে। যাতে তার ভালো লাগে, সেই কাজগুলোতে আমা’র সবসময়ই সায় ছিল। সে ছিল একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। দেশকে যে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসতো। আমা’র ছে’লে ছিল দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

 

তিনি আরও বলেন, চাকরি থেকে অবসর নেবার পর প্রতি রাতে সে আমা’র মশারি টানিয়ে দিত, আমা’র সকল ঔষধপত্র নিজে নিজেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতো, যাতে আমা’র বুঝতে বিন্দুমাত্র সমস্যা না হয়। যখনই বাড়ির বাহিরে যেত, সবসময়ই নিজের চাবি নিয়ে যেত, যাতে আমাকে বির’ক্ত না করতে হয় দরজা খোলার জন্য।আমাকে বিন্দুমাত্র জিজ্ঞাসা না করেও আমা’র সকল আরামের দিকে তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর ছিলো। চাকরির কারণে তার পোস্টিং যেখানেই হোক না কেন আমি যাতে ভালো থাকি, আরামে থাকি সে নিয়ে তাঁর চেষ্টার অন্ত ছিল না। বাড়ির প্রতিটা কাজে আমাকে সাহায্য করতো। সবকাজ সবসময়ই নিজে নিজেই করে আমাকে সবসময় চ’মকে দেওয়ার কাজটা সে খুব ভালো পারতো। আমাদের বাড়ীর প্রতিটি কোণা, প্রতিটি দেয়াল সে নিজের হাতে সাজিয়েছিল।

 

তাঁর বাবার মৃ’ত্যুর সময় আমাদের বাড়িটা দুইতলা ছিল। কিন্তু যখন সে এসএসএফে পোস্টিং পেল (তাঁর ১৬ বছরের সাম’রিক জীবনে যে একটি মাত্র সময়েই সে ঢাকায় পোস্টিং পেয়েছিল), তখনই যে হাউজ বিল্ডিং থেকে ঋণ নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে আমাদের বাড়িটা চারতলা করে। এই নির্মাণ কাজের তদারকি করার সে অধিকাংশ সময়ই সে রাতে আসতো যেহেতু এসএসএফের দায়িত্বে ব্যস্ততা অ’ত্যন্ত বেশি থাকায় এছাড়া সময় পেত না।

 

মেজর (অব) রাশেদ খান সিনহার মা বলেন, সে ছিল একজন সত্যিকারের প্রেরণাদাতা, আমাদের সকল আত্মীয়, সব বন্ধু তার কাছ থেকে জীবনের উৎসাহ পেতো। সে সবসময়ই হাস্যজ্জল এক চ’মৎকার মানুষ ছিল যে সবসময়ই মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে এবং অন্যদের সুখী করতে চেষ্টা চালাতো। অ’পরের সুখের জন্য জীবন উৎসর্গ করাই ছিল তাঁর অন্যতম ব্রত।

 

সাবেক মেজর (অব.) সিনহা ২০১৮ সালে স্বেচ্ছায় সে’নাবাহিনী থেকে অবসরে যান। তিনি অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন উপসচিব মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ খানের ছে’লে। গত ৩ জুলাই স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের তিন শিক্ষার্থীসহ ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ভ্রমণ ভিডিও তৈরি করতে কক্সবাজারে যান। ৩১ জুলাই রাতে শামলাপুরের একটি পাহাড়ি এলাকায় শুটিং শেষে ফেরার পথে তল্লা’শির সময় পু’লিশের গু’লিতে নি’হত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *