Categories
জাতীয়

অবশেষে টোকিও অলিম্পিকের সময়সূচি জানালো ওয়ার্ল্ড আরচ্যারী

অবশেষে টোকিও অলিম্পিকের সময়সূচি জানালো ওয়ার্ল্ড আরচ্যারী। ২০২১ এর ২৩ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে এই আসর। প্রথম বারের মত আরচ্যারীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে দেশ সেরা আরচ্যার রোমান সানা কে দেখার জন্য অপেক্ষা করছে সারা বাংলাদেশ।

কয়রার দুর্বার অহংকার, বাংলাদেশের গর্ব, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ক্রীড়াবিদ রোমান সানা।

আমাদের সকলের অনুপ্রেরণায় এভাবেই অনেক দূর এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ আরচ্যারী, এমনটাই প্রত্যাশা তীর এবং সিটিগ্রুপ পরিবারের।

একনজরে জেনে নেই দেশসেরা তীরন্দাজ রোমান সানার কিছু কথা।

তীর-ধনুকের খেলা আর্চারি। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট, ফুটবলের বাইরে আর্চারিতে ভালো করছে বাংলাদেশ। বর্তমান সময়ে আর্চারির বড় বিজ্ঞাপন রোমান সানা। খুলনার এই তীরন্দাজ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইতিহাস গড়ে সরাসারি অলিম্পিকে খেলার সুযোগ অর্জন করেছেন। বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতেছেন। ২০১৯ এসএ গেমসে বাংলাদেশকে রেকর্ড দশটির মধ্যে দশটি স্বর্ণ এনে দিতে অবদান রেখেছেন। নিখুঁত নিশানা, আর গভীর মনোযোগে রোমান সানা করেছেন বাজিমাত। আজ তিনি বিশ্ব আর্চারির সেরা দশজনের একজন। বাংলাদেশ আনসারের এই ল্যান্সনায়েক একের পর এক সাফল্যে দেশকে করেছেন গর্বিত। আজ তার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানবো যেগুলো তিনি বলেছিলেন এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে।

রোমান সানার আর্চারিতে আসাটা যেভাবে

রোমান সানা: সেটা আসলে ২০০৮ সালের কথা। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার স্কুলের এক স্যার ছিলেন, হাসান স্যার। ওনার হাত ধরেই আর্চারিতে আসা। তখন ক্রিকেট, ফুটবল খুব পছন্দ করতাম। তখনও আর্চারি খেলার নাম শুনিনি। প্রথম দিকে খুব একটা পাত্তা দিইনি খেলাটিকে। সে কারণে জাতীয় দলের আর্চার সাজ্জাদ হোসাইন ভাই যে এক সপ্তাহের ক্যাম্পের আয়োজন করেছিলেন সেখানে শুরুতে যাওয়া হয়নি। তবে আস্তে আস্তে ভালো লেগে যায়। ছোটবেলার রবিনহুডকে দেখতাম তীর ছুড়তে। নিজেও তীর বানিয়ে অনেক ছুড়েছি। সে থেকে ভালোলাগা। এরপর আস্তে আস্তে আর্চারির প্রেমে পড়ে যাওয়া। আসলে আর্চারি জেন্টেলম্যান গেম। প্রথম দেখায় যেকারো ভালো লাগবে। ছুড়তে ইচ্ছে করবে।

বাংলাদেশে অর্জনপ্রিয় এমন একটি খেলায় আসার পেছনে পরিবারের সমর্থন কেমন ছিলো?

রোমান সানা: আসলে যেকোনো খেলায় যেতে হলে পরিবারের সমর্থন প্রয়োজন হয়। প্রথমদিকে নিজের গাটের টাকা দিয়ে খেলতে হতো আর্চারি। তখন আব্বা বলতেন যে কি এমন একটা খেলা খেলতে শুরু করেছে যে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে খেলতে হচ্ছে। এরচেয়ে ক্রিকেট, ফুটবল খেলা তো ভালো ছিলো। কিন্তু মা সব সময় বলে গেছেন যে ধৈর্য্য ধরে লেগে থাকো। এক সময় সাফল্য আসবেই। আল্লাহর রহমতে মায়ের দোয়ায় এতোদূর আসতে পেরেছি।

ক্রিকেটের দেশে ক্রিকেটার না হয়ে আর্চার হওয়ার স্বপ্নের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল এবং কতোটা চ্যালেঞ্জিং ছিলো?

রোমান সানা: অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং ছিলো। ক্রিকেট, ফুটবল দুটোই ভালো খেলতাম। কিন্তু একটা সময় মনে হয়েছে এই দুটো খেলা দেশের সবাই খেলতে পারে। সুতরাং আমি যদি ক্রিকেট কিংবা ফুটবলে উপরের পর্যায়ে সুযোগ পেতে চাই তাহলে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। হয়তো আমি নিজের প্রতিভা দেখানোর সুযোগই পাবো না। কারণ, সবাই ক্রিকেটার হতে চায়। সবাই ফুটবলার হতে চায়। আসলে প্রত্যেকটা নতুন খেলাই চ্যালেঞ্জিং। আমি তো প্রথমে ভাবিনি যে আমি একদিন দেশসেরা হবো। আন্তর্জাতিকে ভালো করবো। তবে শুরু থেকেই অনেক পরিশ্রম করে গিয়েছি। সেই পরিশ্রমের ফল পেতে শুরু করেছি।

প্রথম জাতীয় পদক কবে অর্জন করেছিলেন?

রোমান সানা: ২০১০ সালে। মিশ্র দলগতকে রৌপ্য পদক পেয়েছিলাম।

প্রথম ইন্টারন্যাশনাল পদক কবে পেয়েছিলেন?

রোমান সানা : ২০১১ সালে বিকেএসপিতে ইয়ুথ আর্চারিতে দলগত ইভেন্টে রৌপ্য পদক পেয়েছিলাম। ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলেছিলাম। ২০১৪ সালে এশিয়া কাপ স্টেজ-১ এ গোল্ড পেয়েছিলাম।

রিকার্ভ নাকি কম্পাউন্ড কোনটা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

রোমান সানা: অবশ্যই রিকার্ভ। আমি রিকার্ভই খেলি। এটা অলিম্পিক ইভেন্ট। আর কম্পাউন্ড অলিম্পিক ইভেন্ট নয়। এটা মূলত হান্টিং বো দিয়ে খেলা হয়। আর্চারির মূল হল রিকার্ভ। যেটা শত শত বছর আগে থেকেই চলে আসছে।

রোমান সানার স্বপ্ন কি?

রোমান সানা: ওয়ার্ল্ড আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জয় এবং অলিম্পিকে একটা পদক জয়। সেটা ব্রোঞ্জ হোক সমস্যা নেই।

রোমান সানার কোনো আক্ষেপ আছে কি?

রোমান সানা: ব্যক্তিগত কোনো আক্ষেপ নেই। তবে স্পন্সরশিপ নিয়ে আক্ষেপ আছে। আমার মনে হয় বাংলাদেশের অনেক ফেডারেশনেই রোমান সানার চেয়েও অনেক প্রতিভাবানরা আছেন। কিন্তু সেসব ফেডারেশন পর্যাপ্ত স্পন্সর পায় না। সে কারণে তারা উঠে আসতে পারে না। আর্চারির প্রসঙ্গ ভিন্ন। এখন আর্চারিতে তীর কোটি কোটি টাকা স্পন্সর করছে। আর্চারিতে ফল আসছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্পন্সরের অভাব নেই। অথচ অন্যান্য ফেডারেশন অর্থের অভাবে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপই আয়োজন করতে পারে না। তাই আমি বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করবো প্রত্যেকটা ফেডারেশনের জন্য পাঁচটা, পাঁচটা করে স্পন্সর ঠিক করে দিলে বাংলাদেশ ক্রীড়া দিয়ে বিশ্বে অনেক সুনাম কুড়াতে পারবে। যেমনটা সাকিব আল হাসান করছেন। গলফার সিদ্দিকুর রহমান করছেন।

আপনি নাকি সাকিব আল হাসান— বাংলাদেশের সেরা ক্রীড়াবিদ কে? এটা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেটার সহজ সমাধান কি?

রোমান সানা: আসলে অনেকেই আর্চারি সম্পর্কে ভালো ধারনা রাখে না। ক্রিকেট আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। সবাই বোঝে। আর্চারি কয়জন বোঝে? যখন বুঝতে পারবে যে আর্চারি বিশ্বের শত শত দেশ খেলে। একটা আর্চারির ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে কমপক্ষে ৯০টি দেশ অংশ নেয়। রিকার্ভ ইভেন্টে আর্চার ছিলো ২০৯ জন। একটা আর্চারি প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠতে হলে টানা পাঁচটি ম্যাচ জিততে হয়। বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়তে হয়। একটা ম্যাচ হারলেই বাদ। সেখানে ক্রিকেট দলগত খেলা। সবাই মিলে খেলে। একজন ভালো না করলেও অন্যরা টেনে তুলেতে পারে। আর্চারিতে সেটা সম্ভব নয়। আর্চারি বেশ কঠিন খেলা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি। আর্চারি অলিম্পিক ইভেন্ট, ক্রিকেট নয়। আর অলিম্পিক ইভেন্টের মর্যাদাই অন্যরকম। এসব বিষয় যখন সবাই বুঝবে তখন এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। আসলে আমি যদি আর্চারি না খেলতাম তাহলে কিন্তু আমিও ক্রিকেটের ফ্যান হতাম। সাকিব আল হাসান কিংবা মুশফিকুর রহিমের ফ্যান হতাম। আশা করছি আস্তে আস্তে মানুষ আর্চারি সম্পর্কে জানবে, আর্চারির জনপ্রিয়তা আসবে।

আপনার ১০ বছরের ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত কোনটি?

রোমান সানা: অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করা ও ওয়ার্ল্ড আর্চারিতে ব্রোঞ্জ পদক জয়।

আপনার জীবনের ট্রাজেটি/সবচেয়ে কষ্টের কোনো ঘটনা কোনটি?

রোমান সানা: আসলে তেমন কোনো ট্রাজেডি কিংবা কষ্টের ঘটনা নেই। ২০১২ সালের বাইক অ্যাকসিডেন্টটাই আমার জীবনের ট্রাজেডি। খুলনার রূপসা সেতুর নিচে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করি। আমার পা ভেঙে যায়। কখনো ভাবিনি আবার আর্চারিতে ফিরতে পারবো। তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে আবার ফিরতে পেরেছি। অনেক কিছু পেয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *