Categories
জাতীয়

মুখোমুখি দুই প্রতারককে জিজ্ঞাসাবাদ: একজন অপরাধ কবুল করলেও অন্যজন করেনি

একে-অপরকে দোষারোপ করেছেন ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও আরিফ চৌধুরী। গতকাল দিনভর একাধিক কর্মকর্তা এই দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ইতিমধ্যে জেকেজি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ চৌধুরী অনেক অপরাধ কবুল করলেও অস্বীকার করছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বরখাস্তকৃত চিকিৎসক সাবরিনা।

 

নিজেকে বারবার নির্দোষ দাবি করে স্বামী আরিফ চৌধুরীকে দায়ী করছেন। গতকাল বিকালে সাবরিনা-আরিফ মুখোমুখি হতেই সাবরিনা চিৎকার করে তাকে বলতে থাকেন, আমার কথামতো কাজ করলে আজ এই অবস্থা হতো না। সবকিছুর জন্য তুমিই দায়ী। এ সময় অনেকটা নীরব থাকেন আরিফ। এক পর্যায়ে আরিফ বলেন, এখন এসব বলার সময় না।

 

তারা (ডিবি) অনেক তথ্য পেয়ে গেছে। সাবরিনা বারবার আরিফকে দোষারোপ করলে আরিফও উত্তেজিত হন। তিনি বলেন, তোমার বন্ধুরা কোথায়? তারা তোমাকে রক্ষা করতে পেরেছে? আমি গ্রেপ্তারের পর খুব খুশি হয়েছিলে। আমি অপরাধ করলে তুমিও করেছো। তোমার পরামর্শ ছাড়াতো কিছু হয়নি।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কৌশলী ছিলেন সাবরিনা। একেক বার একেক তথ্য দিচ্ছেন তিনি। প্রথমে নিজেকে জেকেজি’র সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান। করোনাভাইরাসের পরীক্ষার নামে জালিয়াতির বিষয়টি তার জানা ছিল না বলেও দাবি করেন। একটি টেলিভিশনে জেকেজি’র চেয়ারম্যান পরিচয়ে বক্তব্য দিয়েছেন জানালে তিনি বলেন, ওই রিপোর্টার এই পরিচয় কোথায় পেলেন তা তার জানা নেই।

 

তিতুমীর কলেজে জেকেজি’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় বক্তব্য দিয়েছিলেন সাবরিনা। ওই বক্তব্য তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে দেননি বলে জানান। স্বামী আরিফ চৌধুরী তাকে বক্তব্য দিতে বাধ্য করেছিলেন। মূলত জেকেজি’র সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন সাবরিনা। এক পর্যায়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জেকেজি থেকে স্বাক্ষর দিয়ে নিয়মিত বেতন উত্তোলনের স্লিপ প্রদর্শন করেন। এ সময় নির্বাক হয়ে যান সাবরিনা। পরে বলেন, সবকিছুর জন্য দায়ী আরিফ চৌধুরী। তবে এক পর্যায়ে এতে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেন তিনি।

 

রিমান্ডে সাবরিনা জানান, আরিফের কর্মকাণ্ড ভালোলাগে না বলেই তাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছেন কিছুদিন আগে। এ বিষয়ে মুখোমুখি হলে আরিফ বলেন, সেলফিশ। নিজেকে রক্ষা করতে বন্ধুর পরামর্শে এটি করেছো। ওই বন্ধু সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। সাবরিনার গ্রেপ্তার এড়াতে তদবির করছিলেন সাবরিনার ওই ডাক্তার বন্ধু। বয়সে সিনিয়র ওই প্রভাবশালী ডাক্তার নেতার সঙ্গে দহরম মহরম রয়েছে সাবরিনার। ওই ডাক্তারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে সাবরিনার কাছে জানতে চাইলে তিনি গোয়েন্দাদের পাল্টা প্রশ্ন করেন, এটা কি এই মামলার বিষয়।

এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে সাবরিনা জানান, আরিফ তাকে সন্দেহ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠিত একজন নারী। তার বন্ধু থাকতেই পারে। জেকেজি’র মামলা থেকে রক্ষা পেতে নয়, বরং ব্যক্তিগত এসব বিষয় ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে আরিফের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার কারণেই তাকে ডিভোর্স দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।জিজ্ঞাসাবাদকালে ডা. সাবরিনা বেশ ক্লান্ত ছিলেন। চুলগুলো এলোমেলো ছিল। আরিফের মুখোমুখি হওয়ার সময় ওড়না দিয়ে চুল ঢেকে নেন তিনি। তার আগে বুধবার সন্ধ্যায় তাদের এক দফা মুখোমুখি করা হয়েছিল। তখনও আরিফের সামনে ক্ষেপে যান সাবরিনা।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা (তেজগাঁও) বিভাগের উপ-কমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল মানবজমিনকে বলেন, জেকেজি যে করোনাভাইরাস পরীক্ষার নামে জালিয়াতি করতো তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাবরিনা এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। সুতরাং সাবরিনা-আরিফ দু’জনেই অপকর্মের জন্য দায়ী। সাবরিনা অপরাধ এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। কিছু স্বীকার করছেন, কিছু অস্বীকার করছেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

 

জেকেজি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ চৌধুরীকে গত বুধবার দ্বিতীয় দফায় চারদিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। গত সোমবার ডা. সাবরিনাকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল ডিবি পুলিশ। গতকাল সাবরিনার রিমান্ড শেষ হয়েছে। ডিবি সূত্রে জানা গেছে, সাবরিনাকে আজ আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে।

জেকেজি’র প্রতারণার বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, করোনা পরীক্ষার নামে প্রতারণার কথা স্বীকার করেছেন ডা. সাবরিনা চৌধুরী এবং তার স্বামী আরিফ চৌধুরী। তবে এই অপকর্মের জন্য রিমান্ডে তারা একে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। টেলিমিডিসিন সেবার নামে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জেকেজি।

 

আরিফ চৌধুরী ও ডা. সাবরিনা বলেছে, জেকেজি ওভাল গ্রুপের একটি সিস্টার কনসার্ন। কিন্তু এ সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেনি। গতকাল দুপুরে মিন্টু রোডে সাংবাদিকদের কাছে আব্দুল বাতেন আরো বলেন, আরিফ ও সাবরিনা করোনাকে কেন্দ্র করে তাদের জেকেজি হেলথ কেয়ারের ভুয়া রিপোর্টের কথা স্বীকার করলেও কি পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে সেটা বলেনি। এ বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, জেকেজি হেলথ কেয়ার থেকে ২৭ হাজার রোগীকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের নমুনা আইইডিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০টি রিপোর্ট তৈরি করা হয় জেকেজি কর্মীদের ল্যাপটপে। এই প্রতারণার মাধ্যমে জেকেজি হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় আট কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *